প্রথম পর্ব:
ইসলামি জগৎ এর সঙ্গীত সম্রাট মরহুম মাওলানা আইনুদ্দীন আল-আজাদ রহ: এর সুযোগ্য একজন ছাত্র বলেন: দীর্ঘ ১৫ বছর পরে কলম ধরলাম বদলে যাওয়া কলরবের বিরুদ্ধে। অপেক্ষায় ছিলাম আজাদ ভাইয়ের ছেলে গালিব বড় হয়ে স্বচক্ষে পরিস্থিতি দেখে একদিন কলরবের দুর্নীতির রহস্য উন্মোচন করতে প্রথম মুখ খুলবে, ইনশাআল্লাহ। আমাদের গালিব (আইনুদ্দীন আল-আজাদ এর পুত্র) মুখ খুলতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে অনেককিছু জানতে পারবেন কেননা এবার সবাই মুখ খুলবে। সারা দেশের সাংস্কৃতিমনা শিল্পীদের মনে কলরব ২ভাগ হয়ে যাওয়া এবং ভাঙণ তৈরি হওয়া নিয়ে নানান কৌতুহল এবং প্রশ্নের অবসান ঘটতে শুরু করেছে। কলরবের প্রাণ হুমায়ুন কবির শাবিব, কাজী আমিনুল ইসলাম, আবু সুফিয়ান রা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার কথাতো ছিলোনা, আইনুদ্দীন আল-আজাদ তো সবাইকে একসাথে রেখে কলরব দিয়ে গিয়েছিলেন আমানত হিসেবে, তাহলে কিসের কষ্ট মনের মধ্যে চাপা দিয়ে আজ তারা দুরে সরে গেলেন? এভাবেই বলতে বলতে প্রশ্ন ছুড়লেন আজাদ রহ: এর ছাত্র আরেকজন আজাদ। এদিকে মাওঃ আইনুদ্দিন আল আজাদ রহ: এর স্ত্রী ও সন্তান সাক্ষাৎকার দেন “আজাদীর কন্ঠ” টিমের কাছে। সন্তান গালিব বিন আজাদ বলেন, কলরবের মালিক মাওলানা আইনুদ্দীন আল-আজাদ এর পরিবারকে কি পরিমান ঠকানো হয়েছে তা হুবহু সাক্ষাৎকার তথ্য প্রমাণাদির আলোকে তুলে ধরতে গেলে এভাবেই শুরু করতে হয় যে, প্রথম মোবাইল ফোনের ওয়েলকাম টিউন বা কলার টিউনে ব্যবহার করা জনপ্রিয় গানের শিল্পী ও কলাকুশলীরা রয়্যালিটি পান না। কেউ কেউ ছিটেফোঁটা কিছু পেলেও তা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। কিছুটা আবার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় সুবিধাভোগী চক্র। কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা আইনুদ্দীন আল আজাদ রহ: এর অসংখ্য জনপ্রিয় গানের রয়্যালিটি তিনি মারা যাওয়ার পর তার পরিবার বা এতিম বাচ্চারাও পাচ্ছে না। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক বদরুজ্জামান উজ্জ্বল ও প্রধান পরিচালক রশিদ আহমাদ ফেরদৌসসহ একটি চক্র গানের রয়্যালিটিসহ কলরবের আয় নিজেরা কুক্ষিগত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চক্রটি কলরবের ইউটিউব চ্যানেলের নাম পরিবর্তন করে নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন। তারা কলরবের টাকায় বিভিন্ন জায়াগায় গাড়ি-বাড়িসহ বিপুল সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি আইনুদ্দীন আল আজাদের স্ত্রী হাবিবা আজাদ তিনি “আজাদীর কন্ঠ” র কাছে এমন লিখিত অভিযোগ করেন। এর সঙ্গে আরও বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র। ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশে এ ধরনের প্রতারণা অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি সংশ্লিষ্টদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহান আল্লাহ তায়ালা, হযরত মুহাম্মদ (স.), সাহাবি (রা.) এবং জীবনমুখী নানা গানে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ইসলামি সংগীত। শুধু মাদ্রাসা-মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মুখে মুখে শোনা যায় এসব গান, নাশিদ বা গজল। ধর্মীয় আবেগ ও অনুভূতি নিয়ে অনেকেই এসব গান দেখেন, শোনেন আবার কেউ কেউ নিজের মোবাইলে ওয়েলকাম টিউন হিসেবেও ব্যবহার করে থাকেন। এজন্য গড়ে উঠেছে নানা শিল্পীগোষ্ঠী। যারা এরই মধ্যে ইসলামি গান, গজল, কৌতুকসহ নানা পরিবেশনায় মানুষের মন জয় করে নিয়েছেন। এর মধ্যে কলরব অন্যতম। ২০০৪ সালের ২৮ মে জাতীয় শিশু-কিশোর ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠন কলরব কে মরহুম আইনুদ্দীন আল আজাদ প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে কলরবের ইসলামি গান ও গজলগুলো জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। বিশেষ করে মোবাইল ফোনে রিংটোন এবং ওয়েলকাম টিউন হিসেবে গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যে কেউ পছন্দের গানের কোড ডায়েল করে ওয়েলকাম টিউনে যুক্ত করতে পারেন। যার ফলে তাকে যে কেউ কল করলে অন্যপ্রান্ত থেকে ওই গানটি শোনা যায়। ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ইসলামি সংগীত বেশ জনপ্রিয়। ২০১০ সালের ১৮ জুন নাটোরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কলরবের প্রতিষ্ঠাতা আইনুদ্দীন আল আজাদ। মারা যাওয়ার আগেই বিটুএম-এর সঙ্গে কলরবের চুক্তি হয়। এ চুক্তিপত্রের একটি কপি আমাদের হাতে সংরক্ষিত আছে। রেজিস্টার্ড গানের তালিকায় ছিল বন্ধু, পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে, ও মদিনার বুলবুলিসহ পাঁচটি গান। তার মৃত্যুর পর গ্রামীণ, বাংলালিংক, রবি, এয়ারটেলে ইসলামি সংগীতের ডব্লিউটি ও আরবিটি ইউজার বাড়তে থাকে। কোটি টাকা আয় : ২০১১ সালের নভেম্বর মাসে ‘স্মৃতির মিনারে আইনুদ্দীন’ শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করে কলরব। স্মারকে ‘সুন্দরের অনুপ্রেরণা’ শিরোনামে স্মৃতিকথা লেখেন বর্তমান নির্বাহী পরিচালক বদরুজ্জামান উজ্জ্বল। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ‘কলরবের গানের ওয়েলকাম টিউন ও রিংব্যাক টিউন ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক কোটি ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে শুধু আইনুদ্দীনের গানের ইউজারই ৪০ লাখ। ’অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৎকালীন সময়ে একজন কলার টিউন ব্যবহারকারীর বিপরীতে মাসে ৩০ টাকা চার্জ নিত মোবাইল ফোন কোম্পানি। মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ‘অন মোবাইল’ এর অর্ধেক অর্থাৎ ১৫ টাকা নিত। আর অন মোবাইলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ‘বিটুএম টেকনোলজিস লিমিটেড’ এর অর্ধেক পেত। সাড়ে ৭ টাকার অর্ধেক বিটুএম রেখে বাকি অর্ধেক অর্থাৎ ৩ টাকা ৭৫ পয়সা গানের মালিক বা স্বত্বাধিকারীকে দিত। কলরবের সংগীতগুলো মোবাইল ফোনে ওয়েলকাম টিউনে যুক্ত করে বিটুএম। সেখান থেকে কলরব ২০১১ সালে প্রথম বিল পায় ১৫ হাজার টাকা। এরপর হু হু ব্যবহারকারী বাড়ার সঙ্গে বিলের অঙ্কও বাড়তে থাকে। বদরুজ্জামানের লেখা স্মৃতি কথার তথ্য অনুযায়ী, কমিশন বাদ দিয়ে শুধু আইনুদ্দীনের গানে ওয়েলকাম টিউনে আয় হওয়ার কথা দেড় কোটি টাকা। আর অন্য শিল্পীসহ মোট আয় হওয়ার কথা ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ‘স্মৃতির মিনারে আইনুদ্দীন’ শীর্ষক স্মারক গ্রন্থে বদরুজ্জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইনুদ্দীন মারা যাওয়ার দেড় বছরের মাথায় শুধু কলার টিউন থেকে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় হয়। যদি গ্রাহক সংখ্যা আর বৃদ্ধি নাও পায়, তাহলে প্রতি মাসে অন্তত ৫ কোটি টাকা আসার কথা। তৎকালীন সময়ে মোবাইল ফোনে কলার টিউন ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালকদের ভাষ্যমতে, কলরবের গানের গ্রাহক তখনকার সময়ে ২ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। কোনো গ্রাহক বাড়েনি ধরে হিসাব করলেও প্রতি বছর কলার টিউন বা ওয়েলকাম টিউন থেকে অন্তত ৬০ কোটি আয় হওয়ার কথা। পাঁচ বছরে যা ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এসব বিষয়ে পরিবারকে যেমন অন্ধকারে রাখা হয়েছে, একই সঙ্গে কলরবের কর্মকর্তাদেরও কোনো তথ্য দেননি। তাছাড়া আইনুদ্দীনের স্ত্রী হাবিবা আজাদ লিখিত অভিযোগে কলরবের আয়ের বেশ কিছু খাতের কথা উল্লেখ করেছেন। যার মধ্যে ‘সারা দেশে কলরবের প্রোগ্রাম, ভর্তি, কর্মশালা, বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ (ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক) আড়াই শতাধিক অডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাপ্ত আয় অন্যতম।’ এসব হিসাব কলরব বা সুরকেন্দ্রের কাউকে দেখানো হয়নি। আইনুদ্দীনের মৃত্যুর পর সংগঠনের তৎকালীন জুনিয়র সদস্য বদরুজ্জামান (উজ্জ্বল) কলরব এবং সুরকেন্দ্রের যাবতীয় আয়-ব্যয় একাই নিয়ন্ত্রণ করছেন শুরু থেকে। তাকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছেন তার প্রধান সহযোগী রশিদ আহমদ ফেরদৌস। তারা দুজনে মিলে কলরবকে দখল করে নিজস্ব সম্পত্তিতে রূপান্তর করেছেন বলে অভিযোগ আইনুদ্দীনের স্ত্রীর। আলাপকালে আইনুদ্দীনের স্ত্রী হাবিবা আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে আব্দুল্লাহহিল গালিব ঢাকার একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত। সেখানকার বেতন প্রতি মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এই টাকার জন্যও ছেলেকে কলরব অফিসে এসে বসে থাকতে হয়। আমি এতিমদের নায্য অধিকার চাই।’ তিনি বলেন, “প্রথমে তারা কোনো টাকা দিত না। কিছুদিন আগে নায়েবে আমিরের মধ্যস্থতায় (ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির) ছেলেমেয়ের মাদ্রাসার বেতন দেওয়া হতো কলরব থেকে। সেই টাকা দেওয়ার সময়ও বদরুজ্জামান আমাদের বলে, ‘কলরবের কোনো আয় নেই, নিজের পকেট থেকে টাকা দিচ্ছি’।” স্ত্রীর অভিযোগ : আইনুদ্দীন আল আজাদের স্ত্রী হাবিবা আজাদ লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, ‘ইসলামি সংগীত-সংস্কৃতির চর্চা, প্রসার ও প্রোডাকশনের কাজ করা কলরবের জন্ম মূলত অডিও প্রকাশনা ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কলরব অডিও হাউজ থেকে, যা পরবর্তীকালে শুধু সাংগঠনিক রূপ দিয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সুরকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান ছিলেন আজাদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রযোজিত এবং প্রকাশিত ২২টি অ্যালবামের অসংখ্য জনপ্রিয় ইসলামি সংগীত বিশেষ করে আইনুদ্দীন আল আজাদের লেখা ও গাওয়া ব্যাপক জনপ্রিয় সংগীত বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরগুলোতে কলার টিউন হিসেবে সর্বোচ্চ আয় করা গানের তালিকায় আসে। ২০১০ সালে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবিসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে রেজিস্ট্রেশন হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই বছর ১৮ জুন আইনুদ্দীন আল আজাদ মারা যাওয়ার পর এই খাত থেকে কত টাকা আসে, তা কেউ জানে না। ১ কোটি ৪০ লাখ ইউজারের বিষয়ে বদরুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, এটা কথার কথা হতে পারে। অনেক সময় রাজনৈতিক নেতারা যে বলেন ১৮ কোটি মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে, সেই ১৮ কোটি তো থাকে না। আবার তিনি বলেন, আমার এই লেখায় ছাপার ভুল হয়েছে। কারেকশন করতে হবে। ওয়েলকাম টিউন থেকে আয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি কিছু বলেননি। অথচ ওয়েলকাম টিউনের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান বিটুএম-এর তথ্যমতে, বর্তমান সময়ে ওয়েলকাম টিউন বা কলার টিউনের জনপ্রিয়তা কমেছে। বেশি মানুষ এই সেবা নিচ্ছে না। বিলের পরিমাণও কমেছে। এরপরও গত মাসে কলরবকে ৫৬ হাজার টাকার একটি বিল দিয়েছে বিটুএম।কলরবের সাবেক প্রধান পরিচালক হুমায়ন কবির শাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজাদ ভাই (আইনুদ্দীন আল আজাদ) বেঁচে থাকতে মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন বদরুজ্জামান। আজাদ ভাই তখন আমাদের বলেন, মোবাইলে কল দিলে অনেকে গান শোনা যায়, আমাদের গানগুলো মোবাইলে কলার টিউন হিসেবে দেওয়া যায় কি না। তখন আমরা এ কাজের জন্য বদরুজ্জামানকে দায়িত্ব দিই এবং তিনি বিটুএম নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেন। তিনি আরও বলেন, আজাদ ভাই মারা যাওয়ার পর বিটুএম থেকে আমরা প্রথম ১৫ হাজার বিল পাই। এরপর বিলের পরিমাণ বাড়তে থাকলে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করার পরামর্শ করি। কিন্তু এতে বদরুজ্জামান রাজি হননি।তৎকালীন অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কলার টিউন থেকে বদরুজ্জামান দ্বিতীয় বিল বাবদ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আসেন। তার দাবি ছিল, যেহেতু তার মাধ্যমে বিলগুলো আসছে, তাই এই টাকা থেকে তাকে একটি মোবাইল কিনে দেওয়ার। কিন্তু সংগঠনের আয় মানে এটা সবার টাকা, তাই আমরা রাজি হইনি। তখন ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেনসহ আর্থিক সচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর বদরুজ্জামান অভিমান করে বাড়ি চলে যায়। তাকে বুঝিয়ে আবার সংগঠনে নিয়ে আসার পর এ নিয়ে আর কেউ কথা বলত না। তিনি বলেন, পরের বিলগুলো ১৪ হাজার, ২০ হাজার এমনকি ৫ হাজার টাকাও জমা হতো। প্রমাণ হিসেবে নামমাত্র একটি রসিদ দেখাত। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করলে কথাকাটাকাটি হতো। ওয়েলকাম টিউনের টাকা যে তছরুপ হচ্ছে, এটা আমরা তখনই বুঝতে পারি। সাবেক একাধিক পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কলার টিউন বা ওয়েলকাম টিউনে টাকার পরিমাণ বাড়তে থাকলে বদরুজ্জামান সংগঠনের অন্যদের ভুল বুঝিয়ে ২০১২ সালে কৌশলে গড়ে তোলেন ‘ব্রাইট সলিউশন মাল্টিমিডিয়া’ (বিএসএম)। তৎকালীন সিনিয়র শিল্পীরাও এ নিয়ে আপত্তি করেননি। তারা ভেবেছিলেন এর মাধ্যমে কলরব এবং ইসলামি সংগীতের প্রচার-প্রসার ঘটবে। কিন্তু ২০১৩ সালে ‘ব্রাইট সলিউশন মাল্টিমিডিয়া’ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর দেখা যায় এর মালিক সম্পূর্ণভাবে বদরুজ্জামান একা। তখন থেকেই তাদের সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। ব্রাইট সলিউশন মাল্টিমিডিয়ার প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলরবের গানগুলো প্রচার ও প্রসারের জন্য আমরা চার-পাঁচজন মিলে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি বা কার্যক্রম সম্পর্কে আমাদের তেমন কিছু জানানো হয়নি। একপর্যায়ে আমাদের বাদ দিয়ে বদরুজ্জামান নিজে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন। বর্তমানে বদরুজ্জামান একই সঙ্গে ব্রাইট সলিউশন মাল্টিমিডিয়ার প্রধান নির্বাহী এবং কলরবের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। কলরব এবং হলি টিউনের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। একজন ব্যক্তি এ দুটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তা থাকায় অনিয়মের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বদরুজ্জামান হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। বতর্মান কমিটিতে থাকা বেশ কয়েকজন এসব অনিয়মের খবর জানলেও সবাই যেন মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তবে নির্বাহী কমিটির সাহিত্য ও থিয়েটার পরিচালক রায়হান ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, শুধু হলি টিউনের ইউটিউব চ্যানেল থেকেই মাসে অন্তত ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয়। প্রতি বছর তিন থেকে চারটা কর্মশালা হয়। সেখানে কয়েক লাখ টাকা, শীত মৌসুমে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ টাকা বাজেটের প্রোগ্রাম হয়, কলরবের নতুন-পুরনো যাবতীয় গানের অনলাইনে আড়াই শতাধিক অডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে টাকা আসে। এসবের হিসাব কেউ জানে না। বদরুজ্জামান ও ফেরদৌসের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, কারও কারও শত শত কোটি টাকার বিজনেস, বাড়ি-গাড়ি হলেও কলরবের নিজস্ব অফিসও নেই। তিনি আরও বলেন, আমি এসব নিয়ে লিখিত অভিযোগও দিয়েছি স্থায়ী পরিষদে। এমনকি ৫ আগস্টের পর থেকে উপদেষ্টা ও স্থায়ী পরিষদে তিনটি লিখিত অভিযোগ জমা আছে আমার। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হয়েছিল কলরবের আলাদা অফিস নেওয়া হবে। ইদানীং আমাদের বলা হচ্ছে, কলরবের নামে পল্টন প্লাজায় ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে। কিন্তু সত্যি কথা হলো, সেটা জামান সাহেবের নিজের নামে ৪০ লাখ টাকা বায়না করা হয়েছে। কলরবের বলতে আসলে কিছু নেই। কলরবের নামে যা কিছু অর্জন, তা দখল হয়ে গেছে। নিজস্ব সম্পত্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা : কলরবের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও অনলাইন অনেকে প্ল্যাটফর্মে এখনো সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আইনুদ্দীন আল আজাদের নাম রয়েছে। আইনুদ্দীন আল আজাদ এবং রশিদ আহমেদ ফেরদৌসের নামে ২০১৭ সালে কলরবের একটি লোগো কপিরাইট অফিস থেকে নিবন্ধন নেওয়া হয়। একই বছর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে কলরবের নামে ট্রেড লাইসেন্স করা হয়। যেখানে শুধু রশিদ আহমেদ ফেরদৌসের নাম দেওয়া হয়। চলতি বছর ৪ এপ্রিল সমাজসেবা অধিদপ্তরের ঢাকা অফিস থেকে নিবন্ধন পায় কলরব। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিবন্ধন এবং সামগ্রিক কার্যক্রম থেকে আইনুদ্দীন আল আজাদকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। রশিদ আহমেদ ফেরদৌস এবং বদরুজ্জামান উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করছেন।কলরবের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেল কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর (কধষধৎধন ঝযরষঢ়রমড়ংঃযর) নাম পরিবর্তন করে নিজের কোম্পানির নামে করে নিয়েছেন। প্রথমে ‘কলরব দ্য হলি টিউন’ এবং পরে কলরব বাদ দিয়ে সরাসরি ‘হলি টিউন’ নাম দিয়ে এক প্রকার দখল করে নেন ইউটিউবে জনপ্রিয় এই চ্যানেলটি। আইনুদ্দীন আল আজাদের বড় ভাই সামছুল আলম বলেন, ‘আমার ভাই মারা গেছেন। তার দুটি এতিম সন্তান আছে। ওদের লেখাপড়াসহ কলরবের আর্থিক বিষয় দেখভাল করার দায়িত্ব দিয়েছিলাম বদরুজ্জামানকে। কিন্তু এখন শুনতে পাচ্ছি সে নাকি সব দখল করছে। কলরবকে ধ্বংস করে হলি টিউন করেছে। আমার মৃত ভাইয়ের সন্তানদের হক যাতে কেউ নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য সবার সহযোগিতা চাই।’ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বদরুজ্জামান উজ্জ্বল ও রশিদ আহমেদ ফেরদৌস। গতকাল বিকেলে পল্টনের জামান টাওয়ারে এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় এ প্রতিবেদকের। পরিবারের অন্য অভিযোগ সম্পর্কে বদরুজ্জামান বলেন, ‘ছেলেমেয়ে পড়ালেখার খরচ আমরা দিয়েছি। ওদের একাধিক মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি। সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোতে খবর নিলে এর সত্যতা পাওয়া যাবে। মেয়ের বিয়ে খরচও আমরা বহন করেছি। আজাদ ভাইকে নিয়ে আমরা কোনো ব্যবসা করিনি।’ তিনি বলেন, ‘যারা এসব অভিযোগ করছে, তারা একটি চক্র। বিভিন্ন সময় নানা অনিয়ম এবং নৈতিক স্খলনের অভিযোগ ওঠায় তাদের কাউকে কলরব থেকে বাদ দেওয়া হয়, আবার কেউ স্বেচ্ছায় চলে গেছে। এখন আবার তারাই ষড়যন্ত্র করছে।’ ব্রাইট সলিউশন মাল্টিমিডিয়ার মালিকানা নিয়ে বদরুজ্জামান বলেন, ‘যারা অভিযোগ করছে, তারা কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবে না। একজন এসে বললেই তো আর আমার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হয়ে যাবে না।’ রশিদ আহমেদ ফেরদৌস বলেন, ‘আইনুদ্দীন আল আজাদ মারা যাওয়ার পর আমাদের টাকা দিয়ে ঝিনাইদহ শহরে বাড়ি করে দিয়েছি। কলরব একটি সংগঠন, এটির নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়। কলরবের যে বিস্তার ঘটেছে, সেটা আইনুদ্দীন পরবর্তী নেতৃত্বের হাত ধরে। আইনুদ্দীনের যে উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ, সেটা পরবর্তী নেতৃত্বের মাধ্যমে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “আইনুদ্দীন আল আজাদের ‘বন্ধু’ ছাড়া প্রত্যেকটি অ্যালবামের স্বত্ব প্রত্যয় প্রডাক্টস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছেন।” প্রত্যয় প্রডাক্টসের মালিক মুফতি মস্তোফা কামাল বলেন, ‘আমি আর আইনুদ্দীন আল আজাদ যৌথভাবে কাজ করতাম। সে গান লিখত, সুর করত, গাইত আর আমি টাকা দিতাম ক্যাসেট বের করতে। আমাদের মধ্যে ফিফটি-ফিফটি পার্টনারশিপ ছিল।’