রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের দায়িত্বশীল সাংবাদিক ও আইপি টিভি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান এবার নিজেই প্রতারণার স্বীকার হলেন ‘ইউনিশপার’ নামক প্রতারণামূলক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে। সরকারি হস্তক্ষেপে কি নিউজ টাইমস মিডিয়া লিমিটেড ফিরে পাবে তার পাওনা অর্থ? এভাবে আর কত্ত প্রতারণা দেখবে প্রিয় বাংলাদেশ।নির্বাক গণমাধ্যম জগৎ।
চটকদার বিজ্ঞাপন আর অবিশ্বাস্য অফারের আড়ালে বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত কি আবারও কোনো বড় ধসের মুখে? ইভ্যালির মোহাম্মদ রাসেলের সেই ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়ার গল্প আমাদের সবার জানা। ঠিক একই পথে হেঁটে রহস্যময় এক উত্থান ঘটেছে মুহাইমিনুল হক ওরফে তিতাসের। রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থেকে পরিচালিত হচ্ছে তার প্রতিষ্ঠান Unishopr.com। সাধারণ এক সেলসকর্মী থেকে আজ সে শতকোটি টাকার কারবারি। কিন্তু তার এই সাফল্যের নেপথ্যে কি হাজারো গ্রাহকের চোখের জল?
একটি বেসরকারি আইপি টিভি চ্যানেলের টাকা আটকে রাখা থেকে শুরু করে শত শত রিফান্ড জালিয়াতি— কী ঘটছে ইউনিশপারের অন্দরমহলে? অনুসন্ধানে নেমেছে দেশের অন্যতম অনুসন্ধানী প্রোগ্রাম ‘সময়ের সংকেত’।
পল্লবীতে মুহাইমিনুলের নতুন সাম্রাজ্য:
রাজধানীর মিরপুর ১২১৬ এলাকার পল্লবীর ২৯/এ রোডের ১/সি-৪ নম্বর ঠিকানাটি এখন এক রহস্যময় সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এখানেই স্থায়ী আস্তানা গেড়েছেন ফজলুল হকের পুত্র মুহাইমিনুল হক তিতাস। আর তার কারবারের মূল কেন্দ্রবিন্দু মিরপুর ডিওএইচএস-এর ১ নম্বর রোডের এভিনিউ-১ এর ১৫০ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টের এক বিশাল ওয়্যারহাউজ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অজপাড়া অঞ্চল থেকে এসে ‘ব্যাকপ্যাক’ কোম্পানিতে সাধারণ এক সেলসকর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এই মুহাইমিনুল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরেই যেন হাতে পেয়ে গেলেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ।
নিউজ টাইম্স-এর ক্যামেরা অর্ডার ও রিফান্ড নাটক:
ইউনিশপার ডট কম নিয়ে এখন অভিযোগের পাহাড়। সম্প্রতি স্বনামধন্য মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ‘ এস এম এফ মিডিয়া লিমিটেড’-এর আওতাধীন আইপি টেলিভিশন ‘নিউজ টাইম্স’ অফিশিয়াল কাজের জন্য একটি হাই-এন্ড ক্যামেরা অর্ডার করে এবং অনলাইন মাধ্যমে সম্পূর্ণ টাকা পেমেন্ট করা হয়। অর্ডার কনফার্ম করা হলেও মাসের পর মাস পার হয়ে গেলেও ক্যামেরা সরবরাহ করেনি ইউনিশপার।
পরবর্তীতে টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় ‘রিফান্ড’ নাটক। দিনের পর দিন সময় নেওয়া, টালবাহানা করা— এ যেন ইভ্যালির সেই পুরনো কূটকৌশল। এক পর্যায়ে ভেঙে ভেঙে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিলেও, বাকি ৮ লক্ষ ৬৪ হাজার ৭০০ টাকা আটকে রেখে চরম টালবাহানা শুরু করে তিতাস।
অফিস কর্মীর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সুকৌশলে লেনদেন:
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিউজ টাইম্স যখন ডাচ-বাংলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা দিতে চায়, তখন তিতাস জানায় তার ডাচ-বাংলা অ্যাকাউন্ট নেই। পরিবর্তে, অফিসে কর্মরত এক নারী কর্মীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সুকৌশলে টাকা নেয় তিতাস। পরবর্তীতে সেই অ্যাকাউন্ট থেকেই টাকা স্থানান্তর হয় ইউনিশপারের অ্যাকাউন্টে। যার সমস্ত ডিজিটাল প্রমাণ এখন গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে।
টিম ‘সময়ের সংকেত’ ও ‘নিউজ টাইম্স’-এর ওপর বর্বর হামলা:
পাওনা টাকার জন্য এবং সত্য অনুসন্ধানে যখন মুহাইমিনুল হক তিতাসের বাসায় টিম ‘নিউজ টাইম্স’ এবং ‘সময়ের সংকেত’ এর অনুসন্ধানী দল যায়, তখন তিতাসের ছোট ভাই এবং তার পরিবার সংবাদকর্মীদের ওপর অতর্কিতে বর্বর হামলা চালায়। লাইভ কভারেজের মূল্যবান ক্যামেরা, অফিশিয়াল আইডি কার্ড এবং ডিভাইস ভাঙচুর করা হয়।
পরবর্তীতে নিউজ টাইম্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পল্লবী থানায় একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তিতাস ও তার ফ্যামিলিকে ডাকলে থানায় এসে তারা সম্পূর্ণ টাকা পাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে নতুন নাটক শুরু করে। ব্যাংকার বোনের ‘মানি লন্ডারিং’ অজুহাত ও মসজিদের ফান্ডের টাকা!
এই চক্রের এক ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি এখন ভাই খবরের আলোয় আসার পর নতুন অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন— টাকা ফেরত দেওয়া নাকি ‘মানি লন্ডারিং’ হবে! মানুষের টাকা আত্মসাৎ করার সময় মানি লন্ডারিংয়ের আইন মনে থাকে না, আর ফেরত দেওয়ার সময় আইনের দোহাই?
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, তিতাসের বাবা নিজেকে ধর্মীয় মানুষ দাবি করলেও তিনি নাকি ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা রিফান্ডের মধ্যে ৫০ হাজার টাকাই দিয়েছেন মসজিদের ফান্ড থেকে! প্রশ্ন জাগে, একজন ধর্মীয় মানুষ হয়ে, আল্লাহর ঘরের পবিত্র টাকা, মসজিদের আমানত কীভাবে নিজের ছেলের ব্যক্তিগত প্রতারণা ও জালিয়াতির দায় মেটাতে ব্যবহার করেন?
আইনি ফাঁকফোকরের অপচেষ্টা ও ভুক্তভোগীদের হাহাকার:
ফেসবুক পেজ ও ভোক্তা অধিকার জুড়ে ভুক্তভোগীদের হাহাকার বলে দিচ্ছে, তিতাসের এই উত্থান আসলে গ্রাহকদের অগ্রিম নেওয়া টাকার পাহাড়। জানা গেছে, পর্দার আড়ালে এক প্রভাবশালী আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যাওয়ার নীল নকশা সাজাচ্ছেন মুহাইমিনুল হক তিতাস।
টিআইএন এবং বিন সার্টিফিকেট থাকলেও প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ইভ্যালির পর এই ইউনিশপারই হবে দেশের ই-কমার্স খাতের নতুন এক ‘ডিজিটাল ট্র্যাজেডি’। ইভ্যালির রাসেলের গন্তব্য যদি কারাগার হয়, তবে মুহাইমিনুল হক তিতাসের গন্তব্য কোথায়?