রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আন্তর্জাতিক সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত পরিষদের মহাসম্মেলনে যোগ দিতে ভোর থেকেই মানুষের ঢল নামে। শনিবার ফজরের পর থেকেই আলেম-ওলামা, ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও তৌহিদি জনতা দলে দলে সম্মেলনস্থলে আসতে থাকেন। কেউ পায়ে হেটে, কেউ নিজস্ব গাড়িতে, আবার কেউ বাস ও মেট্রোরেলে এসে অংশ নেন এ মহাসমাবেশে। সকাল ৯টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ফজরের নামাজ পড়েই নবী প্রেমিক জনগণের জনসমাগমে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলনে কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে বিশ্ববরেণ্য আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের সভাপতি ও পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্য মুফতি ফজলুর রহমান। ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মুফতি আবুল কাসেম নোমানী। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের (ভারত) সভাপতি মাওলানা সাইয়্যিদ মাহমুদ মাদানি, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের মহাসচিব মাওলানা হানিফ জালন্দরি।ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়ত মুভমেন্টের ওয়ার্ল্ড নায়েবে আমীর শায়খ আব্দুর রউফ মক্কি। পাকিস্তানের ইউসুফ বিন্নুরী টাউন মাদ্রাসার নায়েবে মুহতামিম ড. আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরী। পাকিস্তানের মাওলানা ইলিয়াছ গুম্মান এবং মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শায়খ মুসআব নাবীল ইব্রাহিম। সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে অংশ নেন হেফাজতে ইসলামের আমির মাওলানা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, দারুল উলুম হাটহাজারীর মুহতামিম মাওলানা খলিল আহমাদ কুরাইশী, আল হাই-আতুল উলইয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসান, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ দেশের খ্যাতিমান আরও অর্ধশতাধিক আলেমগণ।

কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয় আইনে কাফের ঘোষণার দাবি জানালেন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় শীর্ষ উলামায়ে কেরামগণ_আরও পড়ুন.
বক্তারা বলেন, আমরা সমস্বরে উচ্চস্বরে বলি আমাদের শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ), আমরা তার উম্মত হিসেবে গর্বিত। সুতরাং হযরত মোহাম্মদ (সা.) নবীর পরে কোন নবী নেই। কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত পরিষদ এর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলন থেকে আমাদের এক দফা এক দাবি, অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে কাদিয়ানিদের কাফের ঘোষণা করতে হবে। গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী অনুসারীরা মুসলিম ধর্মের কেহ নয়। সুতরাং মুসলমান পরিচয় দিয়ে মুরতাদী ও কুফুরী কর্মকাণ্ড এই মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশের মাটিতে চলতে দেওয়া হবেনা। কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে সম্মিলিত খতমে নবুওয়াত পরিষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলনে শনিবার সকাল হতেই লোকে লোকারণ্য সোহরাওয়ার্দী ময়দান ও পার্শ্ববর্তী রমনা ও আশপাশের রাস্তাঘাটে জনসমুদ্রের রুপ নেয়। এদিকে নেটিজেনরা বলছেন, এই দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের এই দাবি পূরণে সরকারের কেন এত পিছুটান! ২৪এর গণ-অভ্যুত্থান ৫ই আগস্টের পরপরই এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাবলীগ ইস্যুতে যে কয়েকটি পয়েন্ট আনা হয়েছে,তারমধ্যে অন্যতম রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিম ধর্ম পরিচয়ে কাদিয়ানিদের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি ছিলো। এবিষয়ে বছর পেড়িয়ে গেলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এত অনীহা কেন? এমনটিই আলোচনা/সমালোচনা হচ্ছে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ফেসবুক সহ বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে। সম্মেলনে জনসাধারণ জরিপে অংশগ্রহণকারী তৌহিদী জনতারা বলেন, খতমে নবুওয়ত মহাসম্মেলন কোন হঠাৎ করে হওয়া প্রোগ্রাম না। কাদিয়ানী ইস্যু নিয়ে বছর জুড়ে যে নানা ধরনের কর্মসূচী থাকে-এটাও তার একটা পার্ট৷ কোন অস্থিরতা তৈরি করা এ প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য না। কাদিয়ানি ইস্যুটা আপনারা যতটা সরল মনে করেন, ইস্যুটা অতটা সরল না। এটা মুসলমান থাকা না থাকার ইস্যু। দেখেন, কাদিয়ানীরা যে অমুসলিম এটা নিয়ে উলামায়ে কেরামের কোন ইখতেলাফ/মতভেদ নাই। সকল ঘরনার আলেম-উলামাগণ এবিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তাহলে সমস্যা কোথায়! সমস্যা হলো তারা নিজেদের মুসলমান পরিচয় দেয়। মুসলমান পরিচয় দিলে সমস্যা কোথায় এবিষয়ে বক্তারা বলেন,
১৷ অমুসলিমদের সাথে বিবাহ জায়েজ নেই। তারা যেহেতু নিজেদের মুসলমান পরিচয় দেয়, যেহেতু তাদের নাম আমাদের মতই, অনেকে ধোকা খাইতে পারে। তাদের সাথে বিবাহের মাধ্যমে একটা হারাম কাজে জড়িয়ে যেতে পারে।
২। কাদিয়ানী উপাসনালয়ে বা তাদের ঈমামের পিছনে নামাজ পড়া বৈধ হবে না। তারা যেহেতু মুসলমান পরিচয় দেয়, মুসলমানদের ধোকা খাওয়ার পসিবিলিটি আছে।
৩। কারো সন্তান যদি কাদিয়ানী হয়ে যায়, তাহলে সে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, বাপের সম্পদ পাবে না।
৪। কোন অমুসলিমের মক্কা মদিনায় প্রবেশ জায়েজ নাই। তারা যেহেতু নিজেদের মুসলমান পরিচয় দেয়, হারামাইন এখনো তাদের জন্য উন্মুক্ত।
৫। তারা মুসলমান না হয়েও মুসলমানদের পরিভাষাগুলো ব্যবহার করে। এতে অন্য মুসলমানরা ধোকা খায়।
৬। তারা খুব সুক্ষ্মভাবে দাওয়াত দেয়। প্রথমে স্বীকার করে না যে তারা নবীজিকে শেষ নবী মনে করে না। তাদের কারণে বহু মুসলমান ঈমানহারা হচ্ছে। সচেতনতা তৈরি করাটা জরুরি। সর্বোপরি মহাসম্মেলন আগত আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় শীর্ষ উলামায়ে কেরামরা লাখো লাখো জনতার জনসমুদ্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকট দাবি জানিয়ে বলেন, কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হোক, তারা কাদিয়ানী ধর্মের অনুসারী হিসাবে সব নাগরিক সুবিধা নিয়ে এই বাংলাদেশে বাস করুক – এটা এ ভূখন্ডের মুসলমানদের বহু দিনের দাবি। আমরা চাই, তাদের ধর্ম পরিচয় লুকিয়ে স্বরলপনা মুসলমানদের ধোকা না দিক। ইসলামি বিশ্লেষকরা বলেন, খতমে নবুওয়ত অনেক মূল্যবান ইস্যু। তবে এখন মুসলমানরা গায়রতহীন হয়ে গেছে, নবীজিকে গালি দিলেও এখন আর মুসলমানের গায়ে লাগে না। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। খতমে নবুওয়ত আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন, সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত পরিষদ এর আহবায়ক ও খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ কমিটি বাংলাদেশের আমীর আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বকারী বাংলাদেশের প্রথিতযশা এই প্রবীণ আলেমের সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।