দেশে এখনো টেকসই ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখনো আমরা এমন একটি স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো গড়তে পারিনি, যা জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় কিছু মৌলিক ও সীমিত লক্ষ্য অর্জনই প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি অর্থবহ ও জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ছাড়া দেশের উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। এজন্য স্বাধীন বিচার বিভাগ, শক্তিশালী সংসদ ও সুশাসন নিশ্চিতকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি। প্রশ্ন থেকেই যায়, আসলে এমনভাবে কি আমি আপনি কখনো ভেবে দেখেছি যে, এই বঙ্গীয় অববাহিকার মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা কারণে, এদেশে কোন শাসনই স্থায়ী বা টেকসই হচ্ছেনা! কারণ টা কি?!
নৃতাত্ত্বিক মিশ্রণ দ্রাবিড় বনাম আর্য দ্বন্দ্ব। বাঙালি জাতি কোনো বিশুদ্ধ একক বংশধারা নয়। আমাদের মূলে আছে অস্ট্রিক-দ্রাবিড় (যাদের আর্যরা ‘নিষাদ’ বলত) এবং পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছে আর্য, মঙ্গোলয়েড এবং তুর্কি-পারস্য রক্ত।

বিদ্রোহী ডিএনএ.
আর্যরা যখন ভারতে আসে, বাংলা ছিল তাদের শাসনের বাইরের অঞ্চল। আর্যরা বঙ্গদেশকে বলত “অশুচি দেশ”। এই যে শুরু থেকেই “মূলধারা” বা কেন্দ্রীয় শাসনের প্রতি একটি প্রত্যাখ্যানের মনোভাব, তা আজও বাঙালির রক্তে বিদ্যমান। আমরা আর্যদের ধর্ম বা আইন পুরোপুরি গ্রহণ করিনি, বরং তাকে নিজেদের মতো করে বদলে নিয়েছি।ভৌগোলিক অস্থিরতা (Geographical Determinism) বাংলার মাটি এবং নদী এই অঞ্চলের মানুষের মনস্তত্ত্ব গড়ে দিয়েছে।
নদীমাতৃক অস্থিরতা.
গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটিতে গড়া এই ভূখণ্ডে নদীর গতিপথ প্রতি বছর পরিবর্তন হয়। আজ যে রাজা, কাল তার জমি নদীগর্ভে। এই যে প্রকৃতির অনিশ্চয়তা, এটি মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে—”কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়।”উর্বরতা ও স্বনির্ভরতা: বাংলার মাটি এতই উর্বর ছিল যে মানুষ এককেন্দ্রিক বড় কোনো রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল ছিল না। প্রত্যন্ত গ্রামগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া আইন বা শাসনকে তারা কখনোই জীবন-মরণ সমস্যা মনে করেনি।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ কেন আমরা “টেম্পারড” এবং কেন “শীতল”? মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বাঙালির এই আচরণকে “Cyclical Aggression” বলা যেতে পারে।
ধর্ম ও আইনের ঊর্ধ্বে আবেগ.
বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। এখানে যুক্তি বা আইনের চেয়ে “ব্যক্তিগত বিশ্বাস” বা “গোষ্ঠীগত আবেগ” বেশি কাজ করে। যখন এই আবেগে আঘাত লাগে, তখন জাতি “টেম্পারড” বা চরম উগ্র হয়ে ওঠে (যেমন দাঙ্গা বা গণঅভ্যুত্থান)।
ক্ষনিকের উত্তেজনা (Short-lived Heat)
আমাদের এই ক্ষোভ আবার খুব দ্রুত প্রশমিত হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা একে বলেন “Straw Fire” বা খড়ের আগুন। দপ করে জ্বলে ওঠে, আবার দ্রুত নিভে যায়। কারণ, দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক ধৈর্য প্রয়োজন, তা এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের মধ্যে কম গড়ে উঠেছে।
ব্যক্তিত্বের সংঘাত.
এ অঞ্চলে প্রত্যেকেই নিজেকে একজন “রাজা” মনে করে। “ওয়ারিয়ার্স প্যারাডাইস” বা যোদ্ধাদের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত এই বাংলায় আমরা অন্যের দাসত্ব মানি না ঠিকই, কিন্তু নিজেদের মধ্যে কাউকে নেতা হিসেবে মেনে নিতেও কষ্ট হয়। যার ফলে স্থিতিশীলতা আসে না।
সাসটেনেবিলিটি বা স্থিতিশীলতা কেন নেই?
একটি ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন “Institutional Loyalty” বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য। কিন্তু বাঙালির আনুগত্য সবসময় “Personal” (ব্যক্তিগত)। আমরা আইনকে সম্মান করি না, ব্যক্তিকে করি।আমরা সিস্টেমকে বিশ্বাস করি না, নেতাকে করি। যখনই সেই ব্যক্তি বা নেতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, পুরো সিস্টেমটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সম্রাট অশোকের সময়ও যেটা ছিল, পাল যুগেও তা-ই, এবং বর্তমান পরকালেও সেই একই ছক কাজ করছে।
লেখক ও গবেষক : মোঃ ওয়াসিফ বারী চৌধুরী| সম্পাদক ও প্রকাশক: সাপ্তাহিক ইস্পাত পত্রিকা।