সম্পাদকীয় কলাম:
সমালোচনা মোকাবিলা কারও জন্যই সহজ নয়। অন্যায় বা অশোভন সমালোচনা মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে, এমনকি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও ফাটল ধরাতে পারে। তবে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) এই ক্ষেত্রে এক অপ্রতিম দৃষ্টান্ত। তিনি শুধু সমালোচনাকে ধৈর্য ও বিনয়ের সঙ্গে গ্রহণ করতেন না; বরং তা থেকে ইতিবাচক ফলাফল অর্জনের পথও দেখিয়েছেন। তাঁর জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি কীভাবে সমালোচনার মুখে শান্ত থাকতে হয়, কীভাবে দয়া ও ন্যায়বিচার দিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হয় এবং কীভাবে মানুষের হৃদয় জয় করতে হয়। এই নিবন্ধে তাঁর জীবনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার মাধ্যমে সমালোচনা মোকাবিলার শিক্ষা তুলে ধরা হলো।নবীজির (সা.) দৃষ্টিভঙ্গি মহানবী (সা.) তাঁর নবুয়তের সময়ে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। এই সমালোচনা এসেছিল অবিশ্বাসীদের (মুশরিক, মুনাফিকসহ) থেকে এবং কিছুসংখ্যক মুসলিমের পক্ষ থেকেও। অবিশ্বাসীদের সমালোচনা প্রায়ই ছিল ভিত্তিহীন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপবাদ, যা তাঁর হৃদয়ে ব্যথার সৃষ্টি করত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাঁর এই কষ্টের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই জানি যে তারা যা বলে, তা তোমার হৃদয়কে কষ্ট দেয়।’ (সুরা আল–হিজর, ১৫: ৯৭) অন্যদিকে মুসলিমদের সমালোচনা ছিল ভুল–বোঝাবুঝি বা অপর্যাপ্ত তথ্যের কারণে। তবে উভয় ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)–এর প্রতিক্রিয়া ছিল ধৈর্য, ক্ষমা ও দূরদর্শিতার। তিনি কখনো ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনাকে গ্রহণ করতেন না এবং শুধু আল্লাহর বিধান লঙ্ঘিত হলে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিক্রিয়া দেখাতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ নেননি, যতক্ষণ না আল্লাহর সম্মান লঙ্ঘিত হয়েছে।তখন তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিশোধ নিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১২৬)ঘটনা–১: ইহুদি রাব্বির সমালোচনা ও দয়ার প্রতিক্রিয়া একবার ইহুদি রাব্বি জায়েদ ইবনে সুনআহ নবীজি (সা.)–এর কাছে তাঁর ঋণের টাকা দাবি করতে আসেন। তিনি অভদ্রভাবে নবীজি (সা.)–এর চাদর টেনে নামান এবং বলেন,‘তুমি, আবদুল মুত্তালিবের সন্তান, দেরি করছ।’এই অশোভন আচরণে উমর (রা.) ক্ষুব্ধ হয়ে রাব্বিকে ধমক দেন এবং তলোয়ার দিয়ে হত্যার হুমকি দেন। কিন্তু নবীজি শান্তভাবে হেসে উমর (রা.)–কে বলেন, ‘এ মানুষটি তোমার কাছ থেকে ভালো আচরণের অধিকারী। তোমার উচিত ছিল আমাকে সময়মতো ঋণ পরিশোধের পরামর্শ দেওয়া এবং তাকে ভদ্রভাবে তার দাবি জানানোর অনুরোধ করা।’তিনি জায়েদকে জানান যে পরিশোধের সময়সীমা এখনো তিন দিন বাকি। এরপর উমর (রা.)–কে ঋণ পরিশোধ করতে ও উমরের আচরণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে অতিরিক্ত ২০ মাপ দিতে বলেন। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩৮৮৪)এ ঘটনা থেকে আমরা শিখি যে নবীজি (সা.) অভদ্র সমালোচনার মুখেও শান্ত থাকতেন, প্রতিশোধের পরিবর্তে দয়া ও ন্যায়বিচার প্রদর্শন করতেন এবং পরিস্থিতি থেকে ইতিবাচক ফলাফল অর্জন করতেন। তাঁর এই আচরণ জায়েদের হৃদয়ে ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়েছিল।
ঘটনা–২: আনসারদের অসন্তোষ ও হৃদয় জয়ের কৌশল হুনাইনের যুদ্ধের পর নবীজি (সা.) যুদ্ধ–লব্ধ সম্পদ বণ্টন করেন। এই সম্পদের মধ্যে ছিল প্রায় ৬ হাজার বন্দী, ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজার পশু ও ৪ হাজার পাউন্ড রুপা। তিনি নব্য মুসলিমদের, বিশেষ করে মক্কার কুরাইশদের বেশি অংশ দেন, যাতে তাদের হৃদয় ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু এই বণ্টনে আনসারদের কম অংশ দেওয়ায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করে। তারা মনে করে নবীজি (সা.) তাঁর আত্মীয়দের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছেন।হজরত সা’দ ইবনে উবাদা (রা.) এই অসন্তোষের কথা নবীজি (সা.)–এর কাছে জানান। নবীজি (সা.) প্রথমে সা’দের নিজস্ব অবস্থান জানতে চান। সা’দ বিনয়ের সঙ্গে বলেন, ‘আমি আমার কওমের একজন মাত্র।’নবীজি (সা.) তখন আনসারদের একত্র করতে বলেন। তিনি তাঁবুতে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং বলেন, ‘হে আনসাররা, আমি শুনেছি তোমরা আমার ওপর অসন্তুষ্ট। আমি কি তোমাদের পথভ্রষ্ট অবস্থায় পাইনি, আর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের হেদায়েত দেননি? তোমরা কি দরিদ্র ছিলে না, আর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের ধনী করেননি? তোমরা কি শত্রু ছিলে না, আর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের হৃদয়ে মিলন ঘটাননি?’আনসাররা বলেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সবচেয়ে দয়ালু ও মহৎ।’নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘তোমরা যদি বলতে, তাহলে সত্য বলতে, “তুমি আমাদের কাছে অবিশ্বাসী হয়ে এসেছিলে, আমরা তোমাকে বিশ্বাস করেছি; তুমি সাহায্যহীন হয়ে এসেছিলে, আমরা তোমাকে সাহায্য করেছি; তুমি বহিষ্কৃত হয়ে এসেছিলে, আমরা তোমাকে আশ্রয় দিয়েছি; তুমি দরিদ্র হয়ে এসেছিলে, আমরা তোমাকে সমৃদ্ধ করেছি।”হে আনসাররা, তোমরা কি সেই পার্থিব জিনিসের জন্য অসন্তুষ্ট, যা আমি কিছু লোককে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য দিয়েছি? তোমরা কি সন্তুষ্ট নও যে লোকেরা ভেড়া ও উট নিয়ে চলে যাবে, আর তোমরা আল্লাহর রাসুলকে তোমাদের বাসভূমিতে নিয়ে যাবে? আল্লাহর কসম, যদি হিজরত না হতো, আমি আনসারের একজন হতাম।’রাসুল (সা.) শেষে দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ, আনসারদের, তাদের সন্তানদের ও তাদের সন্তানদের সন্তানদের ওপর করুণা কর।’এই কথাগুলো শুনে আনসাররা অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন, ‘আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)–কে আমাদের ভাগ্য ও অংশ হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৩৩০)এ ঘটনা থেকে আমরা শিখি যে নবীজি (সা.) সমালোচনার মুখে তিরস্কারের পরিবর্তে তাদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, তাদের মর্যাদা উঁচু করেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনের দূরদর্শী কারণ ব্যাখ্যা করেন।তিনি আনসারদের অসন্তোষের মূল কারণ—প্রত্যাখ্যাত বোধ করার অনুভূতি বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাদের ভালোবাসা ও সম্মান দিয়ে হৃদয় জয় করেছিলেন।