রাজধানীর দিলকুশায় অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে থাকা দুটি লকার ভেঙে ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধার করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। আদালতের অনুমতি নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট, দুদক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) রাতে লকার দুটি খোলা হয়।
★কীভাবে লকার শনাক্ত ও জব্দ-
এনবিআর ও ব্যাংক সূত্র জানায়, রাজধানীর দিলকুশায় অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখা (সাবেক স্থানীয় কার্যালয় শাখা) ভবনে শেখ হাসিনার নামে ৭৫১ ও ৭৫৩ নম্বর দুটি লকার রয়েছে। কর ফাঁকি ও সম্পদ গোপনের অভিযোগে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে গত ১৬–১৭ সেপ্টেম্বর এনবিআরের সিআইসি আদালতের আদেশ নিয়ে লকার দুটি জব্দ করে। তখন লকারের ভেতরে কী আছে, তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা এনবিআর কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি।
★লকার খোলা ও স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা-
মামলার অগ্রগতি এবং তদন্তের প্রয়োজনে ২৫ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালত এনবিআরকে লকার দুটি খোলার অনুমতি দেয়। ওইদিন সন্ধ্যায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, এনবিআরের সিআইসি, দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে লকার দুটির তালা ভেঙে খোলা হয়। লকারের ভেতরে রাখা জিনিসপত্র গণনা ও তালিকাভুক্তির পর তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, দুই লকারে মিলে মোট ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার মজুত ছিল।
★কী কী স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে-
এনবিআরের একটি দায়িত্বশীল সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, লকার দুটিতে থাকা স্বর্ণের বেশির ভাগই নেকলেস, বালা, ব্রেসলেট, কানের দুল, আংটি ও অন্যান্য অলংকারজাত গয়না, যেগুলোর মোট ওজন প্রায় ৮৩২ থেকে ৮৩২.৫ ভরি হিসেবে হিসাব করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে পরিমাণ ৮৩৩ ভরি উল্লেখ থাকলেও সব হিসাবই প্রায় একই ওজনের দিকে ইঙ্গিত করছে, যা কাগজপত্র খতিয়ে দেখার পর চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ হবে। তদন্ত–সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বর্ণালংকারগুলোর ধরণ, ক্যারেট মান ও বাজারমূল্য নির্ধারণে আলাদা বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করবে।
★কর ও দুর্নীতি তদন্তের প্রেক্ষাপট-
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে এনবিআরের সিআইসি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কয়েক মাস ধরে যৌথভাবে তথ্য সংগ্রহ করছে। এর আগে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শুরুতে রাজধানীর মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে পুবালী ব্যাংকের একটি শাখায় শেখ হাসিনার নামে থাকা ১২৮ নম্বর আরেকটি লকার ও দুটি ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়, যেখানে কি রয়েছে তার সঠিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তকারী সংস্থাগুলো বলছে, সব ব্যাংক হিসাব, লকার ও স্থাবর–অস্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করে তা তাঁর আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে কর ফাঁকি, অর্থপাচার বা অবৈধ সম্পদ থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
★আইনি অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ-
লকার থেকে উদ্ধার স্বর্ণালংকারগুলো এখন মামলার আলামত হিসেবে রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকবে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া এগুলো স্থানান্তর বা ব্যবহার করা যাবে না। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ধাপে স্বর্ণের পরিমাণ ও প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করে তা কর ফাইলে ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা হবে; অমিল ধরা পড়লে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কর আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুদকের আইনে পৃথক মামলা হতে পারে। ইতিমধ্যে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং বোন শেখ রেহানার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবও সাময়িকভাবে জব্দের নির্দেশ দিয়েছে।
★রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জনমতের আলোড়ন-
৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দল ও সংগঠন এ ঘটনাকে গত সরকারের দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত বিচার ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের দাবি তুলেছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত লকারে এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ থাকা এবং তা কর নথিতে যথাযথভাবে দেখানো হয়েছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
-মনজুর এহসান চৌধুরী|📰✍🏻
সাংবাদিক-সম্পাদক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক।